লেইম লাভার Love Stories......
নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তায় চলেছি একা-
সেই আদি আমলের গানটা গাইতে গাইতে
আপন মনে হাঁটছিলাম ! হঠাত্ বজ্রাহত হলাম !
না, ভুল ভাবছেন । ঢাকা শহরের অগণিত
ম্যানহোল গুলোর মাঝে একটি আমাকে
আপন ভেবে কাছে টেনে নেয় নি ! আপন
মনে হাঁটলেও আমি যথেষ্ট সতর্ক ভাবেই হাঁটি
।
স্তম্ভিত হলাম কারণ ছোটকাল থেকে
যেরকম রাজকুমারীর ছবি আমার মানসপটে
লালন করে এসেছি ঠিক তার এক বাস্তবরূপই
রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে । চোখে
মুখে বিচলতি ভাব । কি যেন খুঁজছে !
“পাইলাম ! আমি ইহারে পাইলাম !!” চারপাশের এত
লোকজন, গাড়ি-ঘোড়া, বিল্ডিং সব হঠাত্ অদৃশ্য
হয়ে আমি নিজেকে অবারিত সবুজের মাঝে
আবিস্কার করলাম ! ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর নাচ
চলছে ! কিন্তু গান শুরু হওয়ার আগেই প্রচন্ড
এক ধাক্কা খেয়ে বাস্তব জগতে ভূপাতিত হলাম
। সাথে কর্কশ একটা কন্ঠস্বর কানে বিঁধল- ঐ
মিঞা ? খাম্বার লাহান রাস্তার মাঝখানে দাঁড়াইয়্যা
রইলেন কিল্লাইগ্যা ? রাস্তারে কি বাপের মাল
মনে অয় নি ?
ইচ্ছে করছিল লোকটারে কসাই একটা থাপ্পর
দিয়ে কয়েকটা কড়া কথা শুনাই দিই !
কিন্তু বহুকষ্টে নিজেকে দমন করলাম । কারণ
আমার আমার স্বপ্নকুমারী ততক্ষণে হাঁটা শুরু
করেছে । এখানে যদি একটা গ্যান্জ্ঞাম
বেজে যায় তবে তাকে মিস করে ফেলতে
পারি ! তাই কোন রকমে স্যরি বলে ব্যাপারটা
পাশ কাটিয়ে রাস্তা পার হলাম ! ঘন্টায় ৮০ মাইল
বেগে ছুটে আসা একটা ট্রাকের নিচে
পড়তে পড়তেও কপালের জোর ছিল বিধায়
বেঁচে গেলাম ! কিন্তু এ কি ?
মেয়েটা খুঁড়িয়ে হাঁটছে । দেখলে হঠাত্
বুকের মাঝে ধাক্কার মত লাগে । এত সুন্দরী
একটা মেয়ে অথচ সে খোঁড়া ! মেনে
নিতে কষ্ট হচ্ছে । মনে মনে সৃষ্টিকর্তার
কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করলাম । তবে
আরেকটু এগুতে প্রচন্ড হাসি পেয়ে যায় ।
মেয়েটি খুঁড়েয়ে হাঁটছে বলে নয়, কিসব
উল্টা পাল্টা চিন্তা করছি সেসব ভেবে ! কারণ
সে মোটেও খোঁড়া নয় । সম্ভবত
স্যান্ডেল ছিঁড়ে ফেলেছে !
কাছে গিয়ে আমার বহুল প্রশংসিত হাসিটা উপহার
দিয়ে জানতে চাইলাম- কোন সাহায্য করতে
পারি ?
বেচারি প্রথমে থমথমে খেল । তারপর
হতবিহ্বল ভাবটা কাটিয়ে ভ্রু কুচকে আমার দিকে
এমন ভাবে তাকাল যেন এই মাত্র শনির বলয়
থেকে নেমে এসেছি ! অথবা আমার
পেছনে বড় একটা লেজ গজিয়েছে কিংবা
আমি কিম্ভুতকিমাকারের এক এলিয়েন ! তার
ভাবসাভ দেখে মনে হল- ছেঁড়া স্যান্ডেল
নিয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার আর
তাকে সাহায্য করতেই চাওয়াটাই চূড়ান্ত
অস্বাভাবিক !
সে তার অগ্নি দৃষ্টি দিয়ে আমাকে অবিরাম ভস্ম
করার বৃথা চেষ্টা চালাতে লাগলো ! কিন্তু আমি
নির্বিকার ! মুখে সেই অমায়িক (!) হাসিটা ফুটিয়ে
ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম । ভেতরে ভেতরে
অবশ্য ঘামছি । যদি মেয়েটি হৈ হুল্লো শুরু
করে দেয় তবে পাবলিক আমাকে পিটিয়ে
তক্তা বানিয়ে দেবে ! তবে বাইরে সেটা
প্রকাশ পেতে দিলাম না !
অবশেষে মেয়েটা হার মানলো । দৃষ্টি
সরিয়ে শান্ত স্বরে বলল- কি বললেন ? আমার
সেই একই ভঙ্গি একই প্রশ্ন- কোন সাহায্য
করতে পারি ?
মেয়েটা নার্ভাস একটা হাসি ফুটিয়ে বলল- একটা
মুচির সন্ধান দিতে পারবেন ?
আহ ! কি যে মায়া লাগছিল মেয়েটাকে । এই
মায়াবতী মুখটার দিকে তাকিয়ে পুরো একটা
স্যান্ডেলের ফ্যাক্টরি খুলে দিতে পারি ! আর
মেয়েটা চাইল কিনা একটা মুচির সন্ধান ?
ভেতরের কথা ভেতরে জমিয়ে রেখেই
বললাম- এই তো ! সামনের মোড়েই একজন
বসে !
সে আর দাঁড়াল না । চলে গেল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে
। পিছনে বিভ্রান্তের মত দাঁড়িয়ে রইলাম আমি ।
কি করব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না !
সেদিনের পর থেকে তাকে কত খুঁজলাম
আমি ! নাওয়া খাওয়া সব ভুলে শুধু তাকে নিয়েই
ভাবি । ফেসবুকের ‘Bios’ অপসনে লিখলাম-
কেউ একজন উড়ে নয়,
দৌড়েও নয়,
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমার মন নিয়ে চলে গেল !
আর সেটা দেখে বন্ধুদের সে কি হাসি !
সকাল বিকাল সন্ধ্যা এমন কি গভীর রাতেও
তাদের ঠাট্টাভর্তি মেসেজ ! ফেসবুকের
কল্যাণে সেটা পুরো ক্যাম্পাসেও ছড়িয়ে
গেল । আমার উপাধিই হয়ে গেল ‘ডাবল এল’ !
Lame Lover !
ওরা ভেবেছিল ওদের ঠাট্টা গায়ে মাখিয়ে আমি
সব ছেড়ে ছুড়ে ভদ্র হয়ে যাব !
কিন্তু কিসের কি ? আমার অবস্থা দিন দিন খারাপ
হতে লাগলো ! আমার করুণ অবস্থা দেখে
এক সহৃদয় বন্ধুর উপদেশ- দোস্ত, মুচি হয়ে
যা ! আবার হয়ত কোন একদিন স্যান্ডেল
ছিঁড়লে তোর কাছে আসতেও পারে !
কারো পৌষ মাস,
আর কেউ খায় বাঁশ !
আমার এহেন করুণাবস্থা বোধহয় সৃষ্টিকর্তার
পছন্দ হল না ! তাই তিনি আপন ক্ষমতা বলে এক
মিরাকল ঘটালেন ।
ক্লাস শেষে কয়েকজন বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম
। আমার অবস্থা আগের মতই । আড্ডায় তেমন
একটা সরব নই । এমন সময় এক পিচ্চি এসে একটা
চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল । আমি
হতবম্ভ ! তবে চিরকুটের দিকে তাকিয়ে 440
ভোল্টের শক খেলাম ! তাতে লেখা-
“Facebook এ ছ্যাঁচরামি করে লাভ কি ? খুঁজে
পাবেন বলে মনে হয়? আর ঐদিন ধন্যবাদ
জানানো হয়নি । তাই আজ বলছি- Thanks !”
ঝট করে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি । অস্তির
চোখে কেউ একজনকে খুঁজছি । বন্ধুরা
আমার এহেন আচরণ দেখে বলল- কি রে ?
উঠে পড়লি ক্যান ? বোলতা কামড় দিল নাকি? ঠিক
তখন দেখলাম তাকে ! যার জন্য আমি আজ
কপালে ‘LL’ সাইনবোর্ড লাগিয়ে ঘুরছি ! খানিক
দূরে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে ।
মুখে অদ্ভুত হাসি !
তারপর ?
তারপরের কিছুদিন ছিল আমার জীবনের সেরা
কিছু দিন । কিভাবে যে চলে যাচ্ছিল টেরই
পাচ্ছিলাম না । কত স্বপ্ন, কত কল্পনা, কত আশা
একসাথে বুনছিলাম আমরা।
পুলক ভাই নামক জনৈক মনীষী বলেছেন-
সুখের সময় বেশিদিন স্থায়ী হয় না !
ঠিক সেটাই ঘটল আমার সাথে । একদিন ওর জন্য
ফার্মগেইট অপেক্ষা করছিলাম।
চারটায় দেখা করার কথা ছিল ওর সাথে ! কিন্তু
চারটা পার হয়ে পাঁচটা বেজে গেল কিন্তু ওর
কোন দেখা নেই । আশ্চার্য ! ওতো
কখনো এমনটা করে না । ফোন দিয়ে এই
প্রথম বারের মত ওর মোবাইল বন্ধ পেলাম !
অস্থিরতা বাড়ছে আমার । ও কোন বিপদে
পড়ে নি তো ? ওর ফোন বন্ধ কেন ?
হাজারো দুশ্চিন্ত গ্রাস করতে চাইছিল আমাকে ।
আমি জোর করে সব অশুভ চিন্তা মাথা থেকে
সরিয়ে দিলাম । মনে প্রাণে ভাবতে চাইলাম যে
আমার রাজকন্যা ভালই আছে । সন্ধ্যার
অনেকক্ষণ পরও আমি সেখানে ওর জন্য
দাঁড়িয়ে ছিলাম । কিন্তু ও আসে নি । যখন বাড়ি
আসলাম
তখন পুরোপুরি বিধ্বস্ত আমি ।
ওর বাসা চিনতাম না আমি । ওর তেমন কোন
বন্ধুবান্ধবের সাথেও আমার পরিচয় ছিল না ।
আসলে ওকে পাওয়ার পর শুধু ওকে নিয়েই
এত বেশি ব্যস্ত ছিলাম যে এসব বিষয় নিয়ে
ভাবার সুযোগই পাই নি । আর এখন সে জন্য
সাফার করতে হচ্ছে । সম্ভাব্য সব রকমের
চেষ্টা চালালাম ওর কি হয়েছে, কোথায়
আছে, কেমন আছে তা জানার জন্য । কিন্তু
আমার সব চেষ্টা বিফলে গেল ।
জলজ্যান্ত একটা মানুষ হঠাত্ করেই গায়েব
হয়ে গেল । কোন খোঁজ পেলাম না আমি ।
আমার স্বপ্নকন্যা আমার সাথে নেই- একথা
বিশ্বাস করতেই অনেক কষ্ট হচ্ছিল । কিন্তু
বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই । কারো
জন্য নাকি জীবন থমকে দাঁড়ায় না ! একথা
পুরোপুরি ভাবেই ভুল প্রমাণিত হল আমার
ক্ষেত্রে । আমার
জীবন সেখানেই থমকে দাঁড়াল যেখানে
আমার রাজকন্যা ছেড়ে গিয়েছিল ।
প্রায় চার মাস কেটে গেল । এই চারমাসে
আমার অবস্থা হয়েছে দেখার মত । তবে
বন্ধুরা এ নিয়ে কোন দুষ্টামি করে না । আগে
যেখানে পান থেকে চুন খসলেই তুলকাম
কান্ড বাজত এখন তারা আমার কঠোরাগত
চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেই ভয়
পায় !!
পুরাপুরিই বদলে গেলাম আমি । উজ্জ্বল
ভবিষ্যতের স্বপ্নে ঠাসা এক যুবক থেকে
পরিণত হলাম এক ধ্বংসস্তুপে !!
সৃষ্টিকর্তা বরাবরই আমার প্রতি দয়ালু ছিলেন ।
আমার এই দুরাবস্থা তার বেশিদিন সহ্য হল না । তাই
তিনি আবার স্বপ্নকন্যার সাথে আমার দেখা
করিয়ে
দিলেন । অনেকটা কাকতালীয় ভাবেই….
সেদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতেই
কেন জানি মনটা অনেক ভাল হয়ে গেল ।
কোন কারণ ছাড়াই ! দাড়িতে জন্জ্ঞাল হয়ে
যাওয়া মুখটা অনেক সময় নিয়ে শেইভ করলাম।
অনেক দিন পর উদরপূর্তি করে খেলাম । আমার
স্বপ্নকন্যার উপহার দেয়া
টিশার্ট টা গায়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলাম ।
সারাদিন অনেক ঘোরাঘুরি করলাম । হাঁটতে
হাঁটতে চলে এলাম সেই রাস্তাটায় !
বছরখানেক আগে এই ঘটনার সূত্রপাতটা
যেখানে হয়েছিল ।
কোন কারণ ছাড়াই মনটা ফুরফুর ছিল । হয়ত আমি
না বুঝলেও আমার অবচেতন মন ঠিকই বুঝে
গিয়েছিল আমার স্বপ্নকন্যার দেখা আজ আবার
পাবো আমি !
আপন মনেই গুনগুনিয়ে গাইতে শুরু করেছিলাম-
নীল আকাশের নিচে আমি, রাস্তায় চলেছি
একা…
ইয়েস ! ইটস মিরাকল !
আমি দেখলাম রাস্তার ওধার ধরে একটা মেয়ে
খুঁড়িয়ে হেঁটে চলছে ! বছরখানেক পর
আমার পুরো পৃথিবী আবার থমকে দাঁড়াল !
মেয়েটাই যে আমার স্বপ্নকন্যা তা বুঝতে বাকি
রইল না । কারণ তার গায়ে শোভা
পাচ্ছিল আমার দেয়া থ্রি পিছটাই !!
দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে তার কাছে গেলাম ।
আমাকে দেখতে পায় নি । ডাকতে গিয়েও চুপ
করে গেলাম । একরাশ অভিমান এসে ঘিরে
ধরল আমাকে । চেপে রাখা ক্ষোভ
মেশানো কন্ঠেই বললাম- কি ? আবারও
স্যান্ডেল ছিঁড়েছ !?
আমার কন্ঠস্বর শুনেই থমকে দাঁড়াল ও । এক
ঝলক পিছনে তাকিয়ে আবার দ্রুত হেঁটে
চলে যেতে চাইল ও । আশ্চার্য ! ও পালিয়ে
যেতে চাইছে আমার কাছ থেকে ! কিন্তু
খোঁড়া মানুষ ! কতদূরই বা আর যাবে ! ধরে
ফেললাম ওকে ।
চার মাসের জমিয়ে রাখা সব রাগ ঝাড়লাম ওর উপর
। ও মাটির দিকে তাকিয়ে চুপটি করে সব শুনলো
। কিন্তু কোন উত্তর দিল না । এক ফোঁটা জল
নীরবে গড়িয়ে পড়ল ওর চোখ থেকে !
আমি অবাক হলাম । আমার স্বপ্নকন্যা কাঁদছে ।
প্রচন্ড কষ্ট হল । কিন্তুসান্ত্বনা দিলাম না ওকে ।
ওর কাঁদাই উচিত । গত কয়েকমাসে আমি তো
আর কম কাঁদি নি !
ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম । জুতা
তো ঠিকই আছে । তাহলে খুঁড়িয়ে হাঁটছে
কেন ?
অবাক কন্ঠেই জিজ্ঞাসা করলাম- কি ব্যাপার ?
তোমার জূতা তো ঠিকই আছে ।
তাহলে খুঁড়িয়ে হাঁটছ কেন ?
কাঠের নকল পা দিয়ে ঠিকভাবে হাঁটা যায় না- ওর
মৃদু উত্তর । কাঠের পা ! বলছে কি এসব ! বছর
খানেক আগে প্রথম বার ওকে খুঁড়িয়ে
হাঁটতে দেখে যে ধাক্কাটা বুকে লেগেছিল
সেটা আবার অনুভব করলাম । কিছু জিজ্ঞাসা
করতেও ভয়
হচ্ছিল । যদি অপ্রত্যাশিত কিছু শুনি !
আমাকে চুপ থাকতে দেখে আমার স্বপ্নকন্যা
তার মুক্তোঝরানো কন্ঠে বলতে লাগলো
অসহনীয় কথাগুলো- আমাদের বাড়ির কাজ
চলছিল । তোমার সাথে যেদিন দেখার করার
কথা ছিল সেদিন সকালেই ঘটে দূর্ঘটনাটা । আমি
তিনতলার ছাদ থেকে পা পিছলে পড়ে গেলাম
। আর একটা রড় গেঁথে গেল পায়ে । পুরো
এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল । আব্বু
ইমার্জেন্সি ভাবে দেশের বাইরে নিয়ে যান ।
কিন্তু শেষরক্ষা হয় নি । পা টা কেটেই
ফেলতে হয় ।
আমি তখন আর আমার মাঝে নেই । পুরো
দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে ভাসছে ।
তীব্র যন্ত্রনায় চোখ বন্ধ করলাম আমি ।
রড়টা যেন তার পায়ে নয়, আমার পায়েই
ঢুকেছে।
নীরবে কাঁদছিল সে । কিভাবে সান্ত্বনা দেব
তা বুঝতে পারছিলাম না ।
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল- তোমার
সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু
সাহস হয় নি । নিজের অক্ষমতা নিয়ে তোমার
সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে নি । তাই আর
তোমাকে জানাই নি কিছু । কালই দেশে
ফিরেছি । তোমাকে একবার খুব….. খুব করে
দেখতে ইচ্ছে করছিলো । তাই বাসার নিষেধ
সত্ত্বেও এখানে এসেছিলাম যদি
ভাগ্যদেবীর কৃপায় দূর থেকে হলেও
তোমাকে একটি বার দেখতে পাই ! দেখা
তো
হয়েই গেল ।
আমি তখনো চুপ । হে খোদা, এই মিষ্টি
মেয়েটার সাথে তুমি কেন এমনটা করলে? কি
দোষ করেছিল এই নিরাপরাধ মেয়েটা ? কেন
তুমি এমনটা করলে ?
আমাকে চুপ থাকতে দেখেই স্বপ্নকন্যা
আবার বলে উঠল- আর হয়ত দেখা না ও হতে
পারে । ভাল থেকো ।
তারপর সে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে
উদ্ধত হল । আশ্চার্য ! কি সুন্দর করে বলল
ভালো থেকো ! মেজাজ আর ধরে রাখতে
পারলাম না ।
ওর হাত ধরে বললাম- ঐ মেয়ে ? পেয়ছটা কি
তুমি ? সব সিদ্ধান্ত তুমি একাই
নেবে ? আমাকে কি মানুষ বলে মনে হয় না ?
ও অবাক হয়ে বলল- মানে ?
‘মানে মানে ? মানে… মানে… ‘ আমার একটা
সমস্যা আছে । আমি রেগে গেলে
তোতলাতে থাকি । এই ভাবে রেগে থাকলে
তো কথা বলা যাবে না । কথা বলতে হলে
আগে ঠান্ডা হতে হবে । ঠান্ডা হওয়ার জন্য
একটু সময় নিলাম ।
তারপর লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বললাম- মেয়ে,
তোমার জন্য আমার বন্ধুরা আমাকে কি নাম
দিয়েছে জানো ? Lame Lover ! কিন্তু আমি
এতে মোটেও অসুখী না । তোমার জন্য
আমি এক জনম কেন, সাত জনমও Lame Lover
হিসাবে কাটিয়ে দিতে পারবো । আমি
তোমাকে কখনোই একা খুঁড়িয়ে হাঁটতে
দেবো না । তোমার পাশে তোমার হাতটি
ধরে আমিও বাকি জীবনটা হাঁটতে চাই….
:- কিন্তু আমি…..
:- ইশশশশশ…..
থামিয়ে দিলাম ওকে । কোন অজুহাত আমি
শুনতে চাই না । দুজন দুজনার চোখের দিকে
তাকিয়ে আছি । কতক্ষণ জানি না !
এমন সময় পাশ থেকে কেউ একজনকে
বলতে শুনলাম- ঐ মিঞারা ? রাস্তার মাঝখানে
বেক্কলের মত খাড়াইয়্যা রইছেন কিল্লাইগ্যা ?
রাস্তা কি বাপের মাল পাইছেন
??
স্বপ্নকন্যা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল ।
এর ফাঁকে আমি কিন্তু একটা জিনিস দেখে
ফেলেছি- মেয়েটার চোখ অস্বাভাবিক
সুন্দর !!
সেই আদি আমলের গানটা গাইতে গাইতে
আপন মনে হাঁটছিলাম ! হঠাত্ বজ্রাহত হলাম !
না, ভুল ভাবছেন । ঢাকা শহরের অগণিত
ম্যানহোল গুলোর মাঝে একটি আমাকে
আপন ভেবে কাছে টেনে নেয় নি ! আপন
মনে হাঁটলেও আমি যথেষ্ট সতর্ক ভাবেই হাঁটি
।
স্তম্ভিত হলাম কারণ ছোটকাল থেকে
যেরকম রাজকুমারীর ছবি আমার মানসপটে
লালন করে এসেছি ঠিক তার এক বাস্তবরূপই
রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে । চোখে
মুখে বিচলতি ভাব । কি যেন খুঁজছে !
“পাইলাম ! আমি ইহারে পাইলাম !!” চারপাশের এত
লোকজন, গাড়ি-ঘোড়া, বিল্ডিং সব হঠাত্ অদৃশ্য
হয়ে আমি নিজেকে অবারিত সবুজের মাঝে
আবিস্কার করলাম ! ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর নাচ
চলছে ! কিন্তু গান শুরু হওয়ার আগেই প্রচন্ড
এক ধাক্কা খেয়ে বাস্তব জগতে ভূপাতিত হলাম
। সাথে কর্কশ একটা কন্ঠস্বর কানে বিঁধল- ঐ
মিঞা ? খাম্বার লাহান রাস্তার মাঝখানে দাঁড়াইয়্যা
রইলেন কিল্লাইগ্যা ? রাস্তারে কি বাপের মাল
মনে অয় নি ?
ইচ্ছে করছিল লোকটারে কসাই একটা থাপ্পর
দিয়ে কয়েকটা কড়া কথা শুনাই দিই !
কিন্তু বহুকষ্টে নিজেকে দমন করলাম । কারণ
আমার আমার স্বপ্নকুমারী ততক্ষণে হাঁটা শুরু
করেছে । এখানে যদি একটা গ্যান্জ্ঞাম
বেজে যায় তবে তাকে মিস করে ফেলতে
পারি ! তাই কোন রকমে স্যরি বলে ব্যাপারটা
পাশ কাটিয়ে রাস্তা পার হলাম ! ঘন্টায় ৮০ মাইল
বেগে ছুটে আসা একটা ট্রাকের নিচে
পড়তে পড়তেও কপালের জোর ছিল বিধায়
বেঁচে গেলাম ! কিন্তু এ কি ?
মেয়েটা খুঁড়িয়ে হাঁটছে । দেখলে হঠাত্
বুকের মাঝে ধাক্কার মত লাগে । এত সুন্দরী
একটা মেয়ে অথচ সে খোঁড়া ! মেনে
নিতে কষ্ট হচ্ছে । মনে মনে সৃষ্টিকর্তার
কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করলাম । তবে
আরেকটু এগুতে প্রচন্ড হাসি পেয়ে যায় ।
মেয়েটি খুঁড়েয়ে হাঁটছে বলে নয়, কিসব
উল্টা পাল্টা চিন্তা করছি সেসব ভেবে ! কারণ
সে মোটেও খোঁড়া নয় । সম্ভবত
স্যান্ডেল ছিঁড়ে ফেলেছে !
কাছে গিয়ে আমার বহুল প্রশংসিত হাসিটা উপহার
দিয়ে জানতে চাইলাম- কোন সাহায্য করতে
পারি ?
বেচারি প্রথমে থমথমে খেল । তারপর
হতবিহ্বল ভাবটা কাটিয়ে ভ্রু কুচকে আমার দিকে
এমন ভাবে তাকাল যেন এই মাত্র শনির বলয়
থেকে নেমে এসেছি ! অথবা আমার
পেছনে বড় একটা লেজ গজিয়েছে কিংবা
আমি কিম্ভুতকিমাকারের এক এলিয়েন ! তার
ভাবসাভ দেখে মনে হল- ছেঁড়া স্যান্ডেল
নিয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার আর
তাকে সাহায্য করতেই চাওয়াটাই চূড়ান্ত
অস্বাভাবিক !
সে তার অগ্নি দৃষ্টি দিয়ে আমাকে অবিরাম ভস্ম
করার বৃথা চেষ্টা চালাতে লাগলো ! কিন্তু আমি
নির্বিকার ! মুখে সেই অমায়িক (!) হাসিটা ফুটিয়ে
ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম । ভেতরে ভেতরে
অবশ্য ঘামছি । যদি মেয়েটি হৈ হুল্লো শুরু
করে দেয় তবে পাবলিক আমাকে পিটিয়ে
তক্তা বানিয়ে দেবে ! তবে বাইরে সেটা
প্রকাশ পেতে দিলাম না !
অবশেষে মেয়েটা হার মানলো । দৃষ্টি
সরিয়ে শান্ত স্বরে বলল- কি বললেন ? আমার
সেই একই ভঙ্গি একই প্রশ্ন- কোন সাহায্য
করতে পারি ?
মেয়েটা নার্ভাস একটা হাসি ফুটিয়ে বলল- একটা
মুচির সন্ধান দিতে পারবেন ?
আহ ! কি যে মায়া লাগছিল মেয়েটাকে । এই
মায়াবতী মুখটার দিকে তাকিয়ে পুরো একটা
স্যান্ডেলের ফ্যাক্টরি খুলে দিতে পারি ! আর
মেয়েটা চাইল কিনা একটা মুচির সন্ধান ?
ভেতরের কথা ভেতরে জমিয়ে রেখেই
বললাম- এই তো ! সামনের মোড়েই একজন
বসে !
সে আর দাঁড়াল না । চলে গেল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে
। পিছনে বিভ্রান্তের মত দাঁড়িয়ে রইলাম আমি ।
কি করব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না !
সেদিনের পর থেকে তাকে কত খুঁজলাম
আমি ! নাওয়া খাওয়া সব ভুলে শুধু তাকে নিয়েই
ভাবি । ফেসবুকের ‘Bios’ অপসনে লিখলাম-
কেউ একজন উড়ে নয়,
দৌড়েও নয়,
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমার মন নিয়ে চলে গেল !
আর সেটা দেখে বন্ধুদের সে কি হাসি !
সকাল বিকাল সন্ধ্যা এমন কি গভীর রাতেও
তাদের ঠাট্টাভর্তি মেসেজ ! ফেসবুকের
কল্যাণে সেটা পুরো ক্যাম্পাসেও ছড়িয়ে
গেল । আমার উপাধিই হয়ে গেল ‘ডাবল এল’ !
Lame Lover !
ওরা ভেবেছিল ওদের ঠাট্টা গায়ে মাখিয়ে আমি
সব ছেড়ে ছুড়ে ভদ্র হয়ে যাব !
কিন্তু কিসের কি ? আমার অবস্থা দিন দিন খারাপ
হতে লাগলো ! আমার করুণ অবস্থা দেখে
এক সহৃদয় বন্ধুর উপদেশ- দোস্ত, মুচি হয়ে
যা ! আবার হয়ত কোন একদিন স্যান্ডেল
ছিঁড়লে তোর কাছে আসতেও পারে !
কারো পৌষ মাস,
আর কেউ খায় বাঁশ !
আমার এহেন করুণাবস্থা বোধহয় সৃষ্টিকর্তার
পছন্দ হল না ! তাই তিনি আপন ক্ষমতা বলে এক
মিরাকল ঘটালেন ।
ক্লাস শেষে কয়েকজন বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম
। আমার অবস্থা আগের মতই । আড্ডায় তেমন
একটা সরব নই । এমন সময় এক পিচ্চি এসে একটা
চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল । আমি
হতবম্ভ ! তবে চিরকুটের দিকে তাকিয়ে 440
ভোল্টের শক খেলাম ! তাতে লেখা-
“Facebook এ ছ্যাঁচরামি করে লাভ কি ? খুঁজে
পাবেন বলে মনে হয়? আর ঐদিন ধন্যবাদ
জানানো হয়নি । তাই আজ বলছি- Thanks !”
ঝট করে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি । অস্তির
চোখে কেউ একজনকে খুঁজছি । বন্ধুরা
আমার এহেন আচরণ দেখে বলল- কি রে ?
উঠে পড়লি ক্যান ? বোলতা কামড় দিল নাকি? ঠিক
তখন দেখলাম তাকে ! যার জন্য আমি আজ
কপালে ‘LL’ সাইনবোর্ড লাগিয়ে ঘুরছি ! খানিক
দূরে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে ।
মুখে অদ্ভুত হাসি !
তারপর ?
তারপরের কিছুদিন ছিল আমার জীবনের সেরা
কিছু দিন । কিভাবে যে চলে যাচ্ছিল টেরই
পাচ্ছিলাম না । কত স্বপ্ন, কত কল্পনা, কত আশা
একসাথে বুনছিলাম আমরা।
পুলক ভাই নামক জনৈক মনীষী বলেছেন-
সুখের সময় বেশিদিন স্থায়ী হয় না !
ঠিক সেটাই ঘটল আমার সাথে । একদিন ওর জন্য
ফার্মগেইট অপেক্ষা করছিলাম।
চারটায় দেখা করার কথা ছিল ওর সাথে ! কিন্তু
চারটা পার হয়ে পাঁচটা বেজে গেল কিন্তু ওর
কোন দেখা নেই । আশ্চার্য ! ওতো
কখনো এমনটা করে না । ফোন দিয়ে এই
প্রথম বারের মত ওর মোবাইল বন্ধ পেলাম !
অস্থিরতা বাড়ছে আমার । ও কোন বিপদে
পড়ে নি তো ? ওর ফোন বন্ধ কেন ?
হাজারো দুশ্চিন্ত গ্রাস করতে চাইছিল আমাকে ।
আমি জোর করে সব অশুভ চিন্তা মাথা থেকে
সরিয়ে দিলাম । মনে প্রাণে ভাবতে চাইলাম যে
আমার রাজকন্যা ভালই আছে । সন্ধ্যার
অনেকক্ষণ পরও আমি সেখানে ওর জন্য
দাঁড়িয়ে ছিলাম । কিন্তু ও আসে নি । যখন বাড়ি
আসলাম
তখন পুরোপুরি বিধ্বস্ত আমি ।
ওর বাসা চিনতাম না আমি । ওর তেমন কোন
বন্ধুবান্ধবের সাথেও আমার পরিচয় ছিল না ।
আসলে ওকে পাওয়ার পর শুধু ওকে নিয়েই
এত বেশি ব্যস্ত ছিলাম যে এসব বিষয় নিয়ে
ভাবার সুযোগই পাই নি । আর এখন সে জন্য
সাফার করতে হচ্ছে । সম্ভাব্য সব রকমের
চেষ্টা চালালাম ওর কি হয়েছে, কোথায়
আছে, কেমন আছে তা জানার জন্য । কিন্তু
আমার সব চেষ্টা বিফলে গেল ।
জলজ্যান্ত একটা মানুষ হঠাত্ করেই গায়েব
হয়ে গেল । কোন খোঁজ পেলাম না আমি ।
আমার স্বপ্নকন্যা আমার সাথে নেই- একথা
বিশ্বাস করতেই অনেক কষ্ট হচ্ছিল । কিন্তু
বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই । কারো
জন্য নাকি জীবন থমকে দাঁড়ায় না ! একথা
পুরোপুরি ভাবেই ভুল প্রমাণিত হল আমার
ক্ষেত্রে । আমার
জীবন সেখানেই থমকে দাঁড়াল যেখানে
আমার রাজকন্যা ছেড়ে গিয়েছিল ।
প্রায় চার মাস কেটে গেল । এই চারমাসে
আমার অবস্থা হয়েছে দেখার মত । তবে
বন্ধুরা এ নিয়ে কোন দুষ্টামি করে না । আগে
যেখানে পান থেকে চুন খসলেই তুলকাম
কান্ড বাজত এখন তারা আমার কঠোরাগত
চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেই ভয়
পায় !!
পুরাপুরিই বদলে গেলাম আমি । উজ্জ্বল
ভবিষ্যতের স্বপ্নে ঠাসা এক যুবক থেকে
পরিণত হলাম এক ধ্বংসস্তুপে !!
সৃষ্টিকর্তা বরাবরই আমার প্রতি দয়ালু ছিলেন ।
আমার এই দুরাবস্থা তার বেশিদিন সহ্য হল না । তাই
তিনি আবার স্বপ্নকন্যার সাথে আমার দেখা
করিয়ে
দিলেন । অনেকটা কাকতালীয় ভাবেই….
সেদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতেই
কেন জানি মনটা অনেক ভাল হয়ে গেল ।
কোন কারণ ছাড়াই ! দাড়িতে জন্জ্ঞাল হয়ে
যাওয়া মুখটা অনেক সময় নিয়ে শেইভ করলাম।
অনেক দিন পর উদরপূর্তি করে খেলাম । আমার
স্বপ্নকন্যার উপহার দেয়া
টিশার্ট টা গায়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলাম ।
সারাদিন অনেক ঘোরাঘুরি করলাম । হাঁটতে
হাঁটতে চলে এলাম সেই রাস্তাটায় !
বছরখানেক আগে এই ঘটনার সূত্রপাতটা
যেখানে হয়েছিল ।
কোন কারণ ছাড়াই মনটা ফুরফুর ছিল । হয়ত আমি
না বুঝলেও আমার অবচেতন মন ঠিকই বুঝে
গিয়েছিল আমার স্বপ্নকন্যার দেখা আজ আবার
পাবো আমি !
আপন মনেই গুনগুনিয়ে গাইতে শুরু করেছিলাম-
নীল আকাশের নিচে আমি, রাস্তায় চলেছি
একা…
ইয়েস ! ইটস মিরাকল !
আমি দেখলাম রাস্তার ওধার ধরে একটা মেয়ে
খুঁড়িয়ে হেঁটে চলছে ! বছরখানেক পর
আমার পুরো পৃথিবী আবার থমকে দাঁড়াল !
মেয়েটাই যে আমার স্বপ্নকন্যা তা বুঝতে বাকি
রইল না । কারণ তার গায়ে শোভা
পাচ্ছিল আমার দেয়া থ্রি পিছটাই !!
দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে তার কাছে গেলাম ।
আমাকে দেখতে পায় নি । ডাকতে গিয়েও চুপ
করে গেলাম । একরাশ অভিমান এসে ঘিরে
ধরল আমাকে । চেপে রাখা ক্ষোভ
মেশানো কন্ঠেই বললাম- কি ? আবারও
স্যান্ডেল ছিঁড়েছ !?
আমার কন্ঠস্বর শুনেই থমকে দাঁড়াল ও । এক
ঝলক পিছনে তাকিয়ে আবার দ্রুত হেঁটে
চলে যেতে চাইল ও । আশ্চার্য ! ও পালিয়ে
যেতে চাইছে আমার কাছ থেকে ! কিন্তু
খোঁড়া মানুষ ! কতদূরই বা আর যাবে ! ধরে
ফেললাম ওকে ।
চার মাসের জমিয়ে রাখা সব রাগ ঝাড়লাম ওর উপর
। ও মাটির দিকে তাকিয়ে চুপটি করে সব শুনলো
। কিন্তু কোন উত্তর দিল না । এক ফোঁটা জল
নীরবে গড়িয়ে পড়ল ওর চোখ থেকে !
আমি অবাক হলাম । আমার স্বপ্নকন্যা কাঁদছে ।
প্রচন্ড কষ্ট হল । কিন্তুসান্ত্বনা দিলাম না ওকে ।
ওর কাঁদাই উচিত । গত কয়েকমাসে আমি তো
আর কম কাঁদি নি !
ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম । জুতা
তো ঠিকই আছে । তাহলে খুঁড়িয়ে হাঁটছে
কেন ?
অবাক কন্ঠেই জিজ্ঞাসা করলাম- কি ব্যাপার ?
তোমার জূতা তো ঠিকই আছে ।
তাহলে খুঁড়িয়ে হাঁটছ কেন ?
কাঠের নকল পা দিয়ে ঠিকভাবে হাঁটা যায় না- ওর
মৃদু উত্তর । কাঠের পা ! বলছে কি এসব ! বছর
খানেক আগে প্রথম বার ওকে খুঁড়িয়ে
হাঁটতে দেখে যে ধাক্কাটা বুকে লেগেছিল
সেটা আবার অনুভব করলাম । কিছু জিজ্ঞাসা
করতেও ভয়
হচ্ছিল । যদি অপ্রত্যাশিত কিছু শুনি !
আমাকে চুপ থাকতে দেখে আমার স্বপ্নকন্যা
তার মুক্তোঝরানো কন্ঠে বলতে লাগলো
অসহনীয় কথাগুলো- আমাদের বাড়ির কাজ
চলছিল । তোমার সাথে যেদিন দেখার করার
কথা ছিল সেদিন সকালেই ঘটে দূর্ঘটনাটা । আমি
তিনতলার ছাদ থেকে পা পিছলে পড়ে গেলাম
। আর একটা রড় গেঁথে গেল পায়ে । পুরো
এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল । আব্বু
ইমার্জেন্সি ভাবে দেশের বাইরে নিয়ে যান ।
কিন্তু শেষরক্ষা হয় নি । পা টা কেটেই
ফেলতে হয় ।
আমি তখন আর আমার মাঝে নেই । পুরো
দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে ভাসছে ।
তীব্র যন্ত্রনায় চোখ বন্ধ করলাম আমি ।
রড়টা যেন তার পায়ে নয়, আমার পায়েই
ঢুকেছে।
নীরবে কাঁদছিল সে । কিভাবে সান্ত্বনা দেব
তা বুঝতে পারছিলাম না ।
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল- তোমার
সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু
সাহস হয় নি । নিজের অক্ষমতা নিয়ে তোমার
সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে নি । তাই আর
তোমাকে জানাই নি কিছু । কালই দেশে
ফিরেছি । তোমাকে একবার খুব….. খুব করে
দেখতে ইচ্ছে করছিলো । তাই বাসার নিষেধ
সত্ত্বেও এখানে এসেছিলাম যদি
ভাগ্যদেবীর কৃপায় দূর থেকে হলেও
তোমাকে একটি বার দেখতে পাই ! দেখা
তো
হয়েই গেল ।
আমি তখনো চুপ । হে খোদা, এই মিষ্টি
মেয়েটার সাথে তুমি কেন এমনটা করলে? কি
দোষ করেছিল এই নিরাপরাধ মেয়েটা ? কেন
তুমি এমনটা করলে ?
আমাকে চুপ থাকতে দেখেই স্বপ্নকন্যা
আবার বলে উঠল- আর হয়ত দেখা না ও হতে
পারে । ভাল থেকো ।
তারপর সে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে
উদ্ধত হল । আশ্চার্য ! কি সুন্দর করে বলল
ভালো থেকো ! মেজাজ আর ধরে রাখতে
পারলাম না ।
ওর হাত ধরে বললাম- ঐ মেয়ে ? পেয়ছটা কি
তুমি ? সব সিদ্ধান্ত তুমি একাই
নেবে ? আমাকে কি মানুষ বলে মনে হয় না ?
ও অবাক হয়ে বলল- মানে ?
‘মানে মানে ? মানে… মানে… ‘ আমার একটা
সমস্যা আছে । আমি রেগে গেলে
তোতলাতে থাকি । এই ভাবে রেগে থাকলে
তো কথা বলা যাবে না । কথা বলতে হলে
আগে ঠান্ডা হতে হবে । ঠান্ডা হওয়ার জন্য
একটু সময় নিলাম ।
তারপর লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বললাম- মেয়ে,
তোমার জন্য আমার বন্ধুরা আমাকে কি নাম
দিয়েছে জানো ? Lame Lover ! কিন্তু আমি
এতে মোটেও অসুখী না । তোমার জন্য
আমি এক জনম কেন, সাত জনমও Lame Lover
হিসাবে কাটিয়ে দিতে পারবো । আমি
তোমাকে কখনোই একা খুঁড়িয়ে হাঁটতে
দেবো না । তোমার পাশে তোমার হাতটি
ধরে আমিও বাকি জীবনটা হাঁটতে চাই….
:- কিন্তু আমি…..
:- ইশশশশশ…..
থামিয়ে দিলাম ওকে । কোন অজুহাত আমি
শুনতে চাই না । দুজন দুজনার চোখের দিকে
তাকিয়ে আছি । কতক্ষণ জানি না !
এমন সময় পাশ থেকে কেউ একজনকে
বলতে শুনলাম- ঐ মিঞারা ? রাস্তার মাঝখানে
বেক্কলের মত খাড়াইয়্যা রইছেন কিল্লাইগ্যা ?
রাস্তা কি বাপের মাল পাইছেন
??
স্বপ্নকন্যা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল ।
এর ফাঁকে আমি কিন্তু একটা জিনিস দেখে
ফেলেছি- মেয়েটার চোখ অস্বাভাবিক
সুন্দর !!
Leave a Comment